• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩
  • ||
  • আর্কাইভ

চাঁদপুরে পুরানবাজার ভূঁইয়ার ঘাটে পন্টুন সংকটে বাড়ছে দুর্ঘটনা ঝুঁকি

প্রকাশ:  ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

চাঁদপুরের পুরানবাজার এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বাণিজ্য কেন্দ্র।  এ বাণিজ্য কেন্দ্রের ভূঁইয়ার ঘাট দীর্ঘদিন ধরে পল্টুন সংকটে ভুগছে।  এ সংকট এখন শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমিয়ে দিচ্ছে না বরং প্রতিদিনই বাড়িয়ে তুলছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের অভিযোগ—বারবার দাবি জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি, ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর জেলার বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পুরানবাজারের এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়। মেঘনা নদী ও ডাকাতিয়া নদী সংলগ্ন এ ঘাটটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ওঠানামার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু বর্তমানে এখানে মাত্র একটি পন্টুন থাকায় সেই সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে নদীর পানির স্তর কমে গেলে পন্টুনটি কার্যত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এতে করে নৌযান থেকে পণ্য ওঠানো-নামানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের অনেক সময় সরাসরি নৌকা থেকে পণ্য মাথায় নিয়ে পিচ্ছিল ও অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে ওঠানামা করতে হয়, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। ইতোমধ্যে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলেও বড় কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটায় বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি—এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।
চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, ২০১৭ সালের মে মাসে আমরা বিআইডব্লিউটিএ’র উপ-পরিচালকের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছিলাম। তখন দেওয়ানঘাট, ১নং ঘাট এবং জনতা মিল সংলগ্ন নতুন রাস্তার মাথায় তিনটি পল্টুন স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সে সময় আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন, এই ঘাটটি শুধু পুরানবাজার নয়, পুরো চাঁদপুরের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পল্টুন সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক একটি বিষয়।
চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব নাজমুল আলম পাটওয়ারী বলেন, আমরা বহুবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দেখা যায়নি। প্রতিদিন শত শত টন পণ্য এই ঘাট দিয়ে ওঠানামা করে। পর্যাপ্ত পল্টুন না থাকায় সময় বেশি লাগছে, খরচ বাড়ছে এবং ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। আমরা চাই না এমন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটুক। তাই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা ও জনতা লবণ মিলসের মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভূঁইয়ার ঘাটের পন্টুনটি পুরানবাজারের ব্যবসার প্রাণ। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য নৌযান ভিড়ে। কিন্তু একটি মাত্র পন্টুন দিয়ে সেই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নতুন পল্টুন স্থাপন না করলে ব্যবসার গতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
শ্রমিকদের অবস্থাও খুবই নাজুক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি। পন্টুন ঠিকমতো না থাকায় অনেক সময় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। কেউ পড়ে গেলে তাকে বাঁচানোও কঠিন হয়ে যায়। তবুও জীবিকার তাগিদে কাজ করতে হচ্ছে।
অন্য এক শ্রমিক বলেন, বর্ষাকালে কিছুটা সুবিধা থাকলেও শুকনো মৌসুমে কাজ করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। পন্টুন নিচে নেমে যায়, তখন আমাদের অস্থায়ীভাবে কাঠ বা বাঁশ দিয়ে ব্যবস্থা করতে হয়। এটা খুবই বিপজ্জনক।
এ বিষয়ে বন্দর কর্মকর্তা বলেন, আমি বিষয়টি নতুনভাবে জেনেছি। খুব শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবো। এরপর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করবো। প্রয়োজনে সেখানে জেটি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু আশ্বাসে আর কাজ হবে না। দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। তারা মনে করেন, অন্তত তিনটি নতুন পন্টুন স্থাপন করা হলে বর্তমান সংকট অনেকটাই দূর হবে। পাশাপাশি একটি স্থায়ী জেটি নির্মাণ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। নদীবন্দরভিত্তিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে পর্যাপ্ত পন্টুন না থাকলে শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, মানবিক ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। নতুন পন্টুন স্থাপন ও আধুনিক জেটি নির্মাণের মাধ্যমে ভূঁইয়ার ঘাটকে একটি নিরাপদ ও কার্যকর নৌবাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে যেমন ব্যবসার গতি বাড়বে, তেমনি শ্রমিকদের জীবনও নিরাপদ হবে।
পুরানবাজারের ভূঁইয়ার ঘাটের পন্টুন সংকট এখন আর শুধুমাত্র একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়—এটি হয়ে উঠেছে জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।  দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগই পারে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান এনে দিতে।