• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩
  • ||
  • আর্কাইভ

সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সহযোগী না কি সৃজনশীলতার নীরব সংকট?

প্রকাশ:  ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৪
উজ্জ্বল হোসাইন
প্রিন্ট

ডিজিটাল বিপ্লবের এই সময়ে সাংবাদিকতা এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।  তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ধারায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এখন শুধু প্রযুক্তি জগতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গণমাধ্যমের অঙ্গনেও শক্তভাবে জায়গা করে নিয়েছে।  সংবাদ সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, এমনকি প্রতিবেদন লেখার ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।  অনেক ক্ষেত্রে এটি কাজকে সহজ, দ্রুত এবং তথ্যনির্ভর করে তুলছে—কিন্তু একইসঙ্গে উঠছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই প্রযুক্তি কি সাংবাদিকতার সৃজনশীলতাকে সহায়তা করছে, নাকি ধীরে ধীরে তা ক্ষয় করে দিচ্ছে?
বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক সাংবাদিক সরাসরি এআই ব্যবহার করে সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি করছেন।  এটি নিঃসন্দেহে সময় সাশ্রয়ী এবং তাৎক্ষণিক ফলপ্রসূ মনে হতে পারে।  কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকিও কম নয়।  যখন একজন সাংবাদিক নিজে চিন্তা না করে, বিশ্লেষণ না করে একটি যন্ত্রের ওপর নির্ভর করেন তখন তার পেশাগত দক্ষতা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে।  লেখার মৌলিক গঠন, ভাষার শৈলী, তথ্যের ব্যাখ্যা—সবকিছুতেই একধরনের যান্ত্রিকতা প্রবেশ করে।  ফলে সাংবাদিকতার প্রাণ, অর্থাৎ মানবিক অনুভূতি ও গভীরতা, ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয় এটি মানুষের গল্প বলার একটি শক্তিশালী শিল্প।  একটি প্রতিবেদন তখনই প্রভাব ফেলে, যখন সেখানে থাকে মানবিক স্পর্শ, বাস্তব অভিজ্ঞতার গভীরতা এবং লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি।  এআই হয়তো দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে সাজিয়ে দিতে পারে, কিন্তু একজন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কান্না, দুর্যোগে বেঁচে থাকার সংগ্রাম কিংবা সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ—এই অনুভূতিগুলো একটি যন্ত্র কখনোই সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না।  ফলে এআই-নির্ভর প্রতিবেদনগুলো অনেক সময় তথ্যসমৃদ্ধ হলেও প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।  একজন সাংবাদিক যখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকেন, তখন তিনি শুধু আগুনের ক্ষয়-ক্ষতি নয়, মানুষের আতঙ্ক, অসহায়ত্ব এবং বেঁচে থাকার আকুতি প্রত্যক্ষ করেন।  সেই অভিজ্ঞতা তার লেখায় প্রতিফলিত হয়, যা পাঠকের মনে গভীর ছাপ ফেলে।  কিন্তু যদি একই প্রতিবেদন শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক এআই দিয়ে তৈরি করা হয়, তাহলে সেখানে সংখ্যার হিসাব থাকলেও মানবিক আবেগের ঘাটতি থেকেই যাবে।  এটাই সাংবাদিকতা ও যান্ত্রিক লেখার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।
তবে এআই-কে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।  বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি সাংবাদিকতার জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। গবেষণামূলক কাজে, তথ্য যাচাইয়ে, ডেটা বিশ্লেষণে কিংবা নতুন ধারণা খুঁজে পেতে এআই হতে পারে এক অসাধারণ সহায়ক।  উদাহরণস্বরূপ, কোনো জটিল আইনগত বিষয়ের ওপর রিপোর্ট করতে গেলে সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা, পূর্ববর্তী নজির বা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত খুঁজে বের করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  এতে সময় বাঁচে এবং প্রতিবেদনের তথ্যভিত্তিক শক্তি বাড়ে।
কিন্তু এখানেই একটি সীমারেখা টানা জরুরি।  তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে এআই সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যকে ব্যাখ্যা করা প্রেক্ষাপট তৈরি করা এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করার দায়িত্ব একজন সাংবাদিকেরই।  এই ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারলে সাংবাদিকতা তার মৌলিক চরিত্র হারাবে।
বর্তমান সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হিউম্যান টাচ বা মানবিক স্পর্শ।  পাঠক বা দর্শক শুধুমাত্র তথ্য জানতে চায় না; তারা চায় সেই তথ্যের পেছনের গল্প জানতে, অনুভব করতে।  একটি ভালো প্রতিবেদনে লেখকের চিন্তা, অনুভূতি এবং পর্যবেক্ষণের ছাপ থাকে।  এআই-নির্ভর লেখায় এই উপাদানগুলো অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।  ফলে তা পাঠকের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়।
এছাড়া অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতা সাংবাদিকদের মধ্যে অলসতা তৈরি করতে পারে।  যখন সহজেই একটি লেখা তৈরি হয়ে যায়, তখন নিজের মেধা ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।  দীর্ঘমেয়াদে এটি পেশাগত দক্ষতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।  একজন সাংবাদিকের শক্তি তার অনুসন্ধানী মনোভাব, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ভাষার ওপর দক্ষতা।  এই দক্ষতাগুলো চর্চার মাধ্যমে উন্নত হয়—কিন্তু এআই-এর ওপর নির্ভরতা বাড়লে এই চর্চা কমে যেতে পারে।
সাংবাদিকতার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য পড়ার অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  ভালো মানের পত্রিকা, বই, গবেষণাপত্র এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতিবেদন পড়লে একজন সাংবাদিক তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করতে পারেন।  ভাষার বৈচিত্র্য, উপস্থাপনার কৌশল এবং তথ্য বিশ্লেষণের ধরন সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়।  এই অভ্যাস একজন সাংবাদিককে আত্মনির্ভরশীল করে তোলে, যা কোনো প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
এছাড়া মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা সাংবাদিকতার জন্য অপরিহার্য।  বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাদের অভিজ্ঞতা শোনা—এই প্রক্রিয়াগুলো একজন সাংবাদিককে সমৃদ্ধ করে। এআই এই অভিজ্ঞতা দিতে পারে না। এটি কেবল তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা উপলব্ধি করার ক্ষমতা তার নেই।
তবে এটিও সত্য যে আধুনিক সাংবাদিকতা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে।  দ্রুত সংবাদ পরিবেশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতিযোগিতা, দর্শকের পরিবর্তিত চাহিদা—এসবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।  তাই এআই-কে পুরোপুরি বর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়।  বরং প্রয়োজন এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা হতে পারে—এআই-কে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা।  এটি তথ্য সংগ্রহ, ধারণা তৈরি এবং প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করতে সাহায্য করতে পারে।  এরপর সেই খসড়াকে একজন সাংবাদিক নিজের অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ এবং ভাষার দক্ষতা দিয়ে সমৃদ্ধ করবেন। এতে সময়ও বাঁচবে, আবার সৃজনশীলতাও বজায় থাকবে।
এছাড়া গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোরও এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।  সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এআই ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শেখানো উচিত।  পাশাপাশি মৌলিক লেখার দক্ষতা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।  প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সাংবাদিকতা তার মান বজায় রাখতে পারবে।
নৈতিকতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এআই-নির্ভর প্রতিবেদনে অনেক সময় ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকার ঝুঁকি থাকে।  তাই তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব সাংবাদিকেরই।  কোনো তথ্য প্রকাশের আগে তা নিশ্চিত করা পেশাগত দায়িত্বের অংশ। এই দায়িত্ব কোনো যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
পরিশেষে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাংবাদিকতার জন্য একদিকে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, অন্যদিকে এটি একটি সতর্কবার্তাও নিয়ে এসেছে।  এটি যেমন কাজকে সহজ করছে, তেমনি সৃজনশীলতা ও মৌলিকতার জন্য চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।  তাই প্রয়োজন সচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং পেশাগত দায়িত্ববোধ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি কখনো মানুষের বিকল্প নয়; এটি কেবল একটি সহায়ক মাধ্যম। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত শক্তি তার চিন্তা, অনুভূতি এবং বাস্তব অভিজ্ঞতায়।  এই শক্তিকে ধরে রেখেই যদি আমরা এআই-কে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে এটি আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে। আর যদি আমরা অন্ধভাবে এর ওপর নির্ভর করি, তাহলে একসময় আমাদের সৃজনশীলতা এবং পেশাগত স্বাতন্ত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।
সুতরাং, সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—আমরা কি যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হব, নাকি যন্ত্রকে আমাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করব? সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপরই।
লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, এমসিএস, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় মাস্টার্স।