• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩
  • ||
  • আর্কাইভ

স্মৃতির ক্যানভাসে শৈশবের সোনালি দিনগুলো

প্রকাশ:  ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৯
উজ্জ্বল হোসাইন
প্রিন্ট

হারিকেনের মিটিমিটি আলো, গাছতলায় বন্ধুদের আড্ডা, নদীর বুকে ছোট্ট নৌকা, মাটির কলসির ঠান্ডা পানি, হাটের দিনের কোলাহল, ডাকপিয়নের চিঠি, শীতের পিঠা আর সন্ধ্যার আজান—এসবের মধ্যে মিশে আছে বাংলার এক প্রজন্মের শৈশব। সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনযাপনের ধরন। প্রযুক্তির ঝলমলে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আজও মানুষ ফিরে তাকায় সেই ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে, যেখানে আনন্দের জন্য অনেক আয়োজনের প্রয়োজন হতো না সামান্যতেই ভরে উঠত মন।
মানুষের জীবনে শৈশব এমন এক অধ্যায়, যার পাতা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না। বয়স বাড়ে, জীবনের ব্যস্ততা বাড়ে, দায়িত্বের বোঝা কাঁধে চাপে কিন্তু মনের গোপন কোনো এক কোণে শৈশব চিরকাল বেঁচে থাকে। জীবনের ক্লান্ত বিকেলে কিংবা নিঃসঙ্গ রাতের নির্জনতায় হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই দুরন্ত দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে, কীভাবে সামান্য একটি খেলনা, একটি নতুন বই, কয়েকটি রঙিন মার্বেল কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলবেলার খেলাই হয়ে উঠত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
শৈশবের আনন্দ ছিল সহজ, নির্মল ও অকৃত্রিম। সেখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে বন্ধুত্বের মূল্য ছিল বেশি, প্রাপ্তির চেয়ে ভাগাভাগি করার আনন্দ ছিল গভীর। একটি পেয়ারা বা আম কয়েকজন বন্ধু মিলে খাওয়া, বর্ষার পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানো, মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৌড়ে বেড়ানো কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা—এসব ছোট ছোট ঘটনা আজ স্মৃতির ভান্ডারে অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।
এক সময় শিশুরা আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘের আকৃতি দেখে কল্পনার রাজ্য তৈরি করত। কখনো মেঘের ভেতর হাতির ছবি, কখনো পাহাড়, কখনো আবার বিশাল কোনো জাহাজ দেখতে পেত। সেই কল্পনার জগতে ছিল না কোনো সীমারেখা। ছিল না জীবনের কঠিন হিসাব-নিকাশ। ছিল শুধু মুক্ত আকাশের নিচে অবাধে বেড়ে ওঠার আনন্দ।
আজকের শিশুদের সামনে বিনোদনের অগণিত উপকরণ। স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ভিডিও গেম ও ইন্টারনেট মুহূর্তেই তাদের সামনে হাজির করছে এক বিশাল ভার্চুয়াল পৃথিবী। অথচ আগের দিনের শিশুদের বিনোদনের জন্য প্রয়োজন হতো প্রকৃতি, বন্ধুবান্ধব আর একটু অবসর। সেই সামান্য উপকরণ দিয়েই তারা তৈরি করত আনন্দের বিশাল এক জগৎ।
গ্রামের বড় কোনো বটগাছ, পুকুর পাড়, নদীতীর কিংবা আমগাছ ছিল শিশু-কিশোরদের প্রিয় মিলনস্থল। বিকেল হলেই একে একে জড়ো হতো বন্ধুরা। কেউ স্কুলের গল্প বলত, কেউ নতুন শেখা কোনো ছড়া শোনাত, কেউ আবার বানিয়ে বানিয়ে ভূতের গল্প বলত। গল্পের আসর কখন যে সন্ধ্যায় গড়িয়ে যেত তা বোঝার উপায় থাকত না।
কখনো চলত লুকোচুরি, দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি কিংবা ডাংগুলি খেলা। কারও হাতে থাকত মার্বেল, কারও কাছে লাটিম। সামান্য একটি খেলাকে কেন্দ্র করে কখনো অভিমান হতো, আবার কিছুক্ষণ পরেই সব ভুলে একসঙ্গে খেলায় মেতে উঠত সবাই।
বন্ধুত্বের সেই সম্পর্ক ছিল অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত। কারও পরিবারের আর্থিক অবস্থা কেমন, কার পোশাক কত দামি কিংবা কে কোন ব্র্যান্ডের জুতা পরে এসেছে—এসব দিয়ে বন্ধুত্বের গভীরতা মাপা হতো না। বরং যার কাছে নতুন একটি বল থাকত, সে সবার সঙ্গে ভাগ করে খেলত। কারও বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে প্রতিবেশী বন্ধুকেও ডেকে খাওয়ানোর প্রবণতা ছিল।
আজ নগরায়ণ, ব্যস্ত জীবন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের কারণে অনেক জায়গায় সেই গাছতলার আড্ডা হারিয়ে যাচ্ছে। শিশুরা আগের মতো অবাধে মাঠে খেলার সুযোগও সব জায়গায় পাচ্ছে না। তবু পুরোনো দিনের বন্ধুর সঙ্গে বহু বছর পর দেখা হলে সেই গাছতলার স্মৃতি ফিরে আসে। বয়সের ব্যবধান, পেশাগত পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান মুহূর্তের জন্য যেন মিলিয়ে যায়। মনে হয়, সময়ের স্রোত পেরিয়ে সবাই আবার ফিরে গেছে সেই দুরন্ত শৈশবে।
বাংলার প্রকৃতি ও জীবন নদীনির্ভর। নদী, খাল, বিল, পুকুর আর জলাভূমির সঙ্গে বেড়ে ওঠা বহু মানুষের শৈশব জড়িয়ে আছে পানির সঙ্গে। বর্ষা এলেই মাঠঘাট ডুবে যেত, খাল-বিলে পানি বাড়ত। কোথাও কোথাও বাড়ির উঠোন পর্যন্ত পানি চলে আসত। তখন ছোট্ট নৌকায় চড়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার দৃশ্য ছিল পরিচিত। শিশুদের কাছে নৌকা ছিল বিস্ময়ের এক জগৎ। মাঝির বৈঠার ছন্দে নৌকা যখন পানির বুক চিরে এগিয়ে যেত, তখন দুপাশের সবুজ গাছপালা, ধানের খেত আর দূরের গ্রাম যেন চলমান ছবির মতো মনে হতো। নদীর ঢেউয়ে সূর্যের আলো ঝিকমিক করত। বাতাসে ভেসে আসত কাদামাটির গন্ধ।
কেউ নৌকায় বসে মাছ ধরার চেষ্টা করত, কেউ পানিতে হাত ডুবিয়ে ঢেউ তুলত। আবার অনেক শিশু বর্ষার পানিতে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে প্রতিযোগিতা করত—কার নৌকা কত দূর যায়। ছোট্ট সেই নৌকার সঙ্গে ভেসে যেত তাদের কল্পনা, স্বপ্ন আর আনন্দ।
গ্রামের হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, ছিল সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে হাট বসত। সকাল থেকেই আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ আসতে শুরু করত। কেউ আসত ধান, চাল, শাকসবজি কিংবা মাছ নিয়ে কেউ কিনতে আসত পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
হাটের দিন শিশুদের কাছে ছিল বিশেষ আনন্দের। বাবা-মায়ের সঙ্গে হাটে যাওয়ার সুযোগ পেলে তারা খুব খুশি হতো। হাটে খেলনা, বাঁশি, মাটির পুতুল, রঙিন বেলুন, জিলাপি, বাতাসা কিংবা মুড়ি-মুড়কির দোকান তাদের আকর্ষণ করত। অনেক শিশু আগে থেকেই আবদার করে রাখত—হাটে গেলে একটি খেলনা কিংবা মিষ্টি কিনে দিতে হবে।
হাটে গিয়ে পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হতো। এক দোকানে দাঁড়িয়ে চলত গ্রামের খবর, অন্য দোকানে জমত গল্প। কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ—বিভিন্ন পেশার মানুষের মিলন ঘটত সেখানে। হাট ছিল অর্থনৈতিক লেনদেনের পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজের প্রাণকেন্দ্র। কখনো হাট থেকে ফেরার পথে হাতে থাকত ছোট্ট বাঁশি, তাল পাখা কিংবা মাটির খেলনা। বাড়ি ফিরে সেই খেলনা নিয়ে বন্ধুদের সামনে গর্ব করে দেখানো হতো। পরদিন স্কুলে গিয়ে হাটের গল্প শোনানো ছিল আরেক আনন্দ।
এখন অনেক গ্রামে সাপ্তাহিক হাটের পাশাপাশি আধুনিক বাজার, সুপারশপ ও অনলাইন কেনাকাটার সুবিধা তৈরি হয়েছে। তবু হাটের ঐতিহ্য আজও টিকে আছে বহু অঞ্চলে। কারণ হাট শুধু পণ্য কেনার স্থান নয় এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলারও জায়গা।
রাতের খাবার শেষে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসার দৃশ্য ছিল আগের দিনের গ্রামীণ জীবনের অন্যতম সুন্দর মুহূর্ত। ঘরের মাঝখানে কুপি জ্বলছে, বাইরে অন্ধকার, চারদিকে নীরবতা। সেই পরিবেশে শুরু হতো গল্পের আসর।
দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানি শোনাতেন রূপকথা, রাজা-রানির গল্প, ভূতের কাহিনি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কিংবা তাঁদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা। শিশুরা মুগ্ধ হয়ে শুনত। কোনো গল্পের শেষ জানার জন্য পরদিন রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। গল্পের মাঝখানে প্রশ্নের পর প্রশ্ন আসত, আর বড়রা ধৈর্য নিয়ে উত্তর দিতেন।
এসব গল্প শুধু বিনোদন ছিল না এগুলোর মধ্য দিয়ে শিশুরা শিখত নৈতিকতা, সাহস, মানবিকতা, সততা ও পারিবারিক মূল্যবোধ। বড়দের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝতে শিখত, কীভাবে বিপদ মোকাবিলা করতে হয়, কেন অন্যকে সাহায্য করা প্রয়োজন এবং মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা কেন গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে অনেক পরিবারে সবাই একই ঘরে থাকলেও প্রত্যেকে ব্যস্ত থাকে নিজস্ব মোবাইল ফোন বা পর্দার দিকে। প্রযুক্তি যোগাযোগকে সহজ করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সামনাসামনি গল্প করার অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে। অথচ শিশুর মানসিক বিকাশে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, মন দিয়ে কথা শোনা এবং গল্প ভাগাভাগি করার গুরুত্ব অপরিসীম।
পরিবারের সেই কুপি-জ্বলা রাত হয়তো আর ফিরবে না। কিন্তু তার মূল সৌন্দর্য—পরস্পরের কাছে থাকা, কথা বলা এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা—আজও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
একসময় দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই অনেক বাড়ির মানুষ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত। কেউ অপেক্ষা করত প্রবাসে থাকা বাবার চিঠির জন্য, কেউ শহরে পড়তে যাওয়া ভাইয়ের খবর জানার জন্য, কেউবা দূরের আত্মীয়ের লেখা কয়েকটি লাইনের আশায়।
চিঠি আসার আনন্দ ছিল অন্য রকম। খামের ওপর পরিচিত হাতের লেখা দেখেই অনেক সময় প্রেরককে চিনে ফেলা যেত। খাম খুলে ধীরে ধীরে চিঠি পড়া, বারবার একই লেখা দেখা, কখনো পরিবারের সবাইকে পড়ে শোনানো—এসব ছিল আবেগের অংশ।
চিঠির প্রতিটি বাক্যে যেন বহন করে আনা হতো দূরের মানুষের উপস্থিতি। কেউ লিখত বাড়ির খবর, কেউ জানাত পড়াশোনার কথা, কেউ লিখত মায়ের শরীর কেমন আছে। প্রিয়জনের হাতের লেখা ছুঁয়ে মনে হতো, দূরত্ব কিছুটা হলেও কমে এসেছে। চিঠির উত্তর লেখারও ছিল আলাদা প্রস্তুতি। কাগজ, কলম, খাম ও ডাকটিকিট জোগাড় করে বসতে হতো। কী লিখব, কীভাবে মনের কথা জানাব—তা ভেবে অনেক সময় কেটে যেত। তারপর ডাকবাক্সে চিঠি ফেলে শুরু হতো অপেক্ষা। 
আজ একটি বার্তা পাঠাতে কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। ভিডিও কলে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা মানুষকেও দেখা যায়। যোগাযোগের এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আশীর্বাদ। তবে হাতে লেখা চিঠির যে ব্যক্তিগত আবেগ, অপেক্ষার যে মধুরতা, আর প্রিয়জনের অক্ষরে অক্ষরে নিজের জন্য লেখা কথা পড়ার যে অনুভূতি—তা প্রযুক্তির দ্রুততায় পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়নি।
গ্রামীণ বাংলার পুরোনো বাড়িগুলোর সঙ্গে ধানের গোলার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। কৃষকের ঘরে নতুন ধান উঠলে আনন্দের সীমা থাকত না। গোলাভরা ধান ছিল পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা, পরিশ্রমের ফল এবং ভবিষ্যতের আশ্বাস।
ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো ও গোলায় তোলার সময় বাড়িতে বাড়তি ব্যস্ততা দেখা দিত। উঠোনে ধান শুকানো হতো। পরিবারের সদস্যরা নানা কাজে হাত লাগাতেন। কোথাও ধান ঝাড়ার শব্দ, কোথাও গরুর গাড়ি, কোথাও আবার কৃষকের হাসিমুখ—সব মিলিয়ে তৈরি হতো উৎসবের আবহ।
শিশুরা উঠোনে খেলত, ধানের স্তূপের পাশে ঘুরে বেড়াত। কখনো বড়দের কাজ দেখতে দেখতে কৃষিজীবনের নানা বিষয় শিখত। মাটির ঘর, খড়ের চাল, বাঁশের বেড়া, উঠোনের কোণে গরুর গোয়াল আর পাশে ধানের গোলা—এসব দৃশ্য ছিল বাংলার বহু পরিবারের পরিচিত বাস্তবতা।
বাড়ির রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত নতুন চালের ভাত কিংবা পিঠার গন্ধ। নতুন ধানের চাল দিয়ে রান্না করা খাবার পরিবারের সবাই মিলে খাওয়ার মধ্যে ছিল আলাদা তৃপ্তি। ফসলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যে কত গভীর, তা শিশুরা ছোটবেলা থেকেই বুঝতে পারত।
বর্তমানে কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে, ঘরবাড়ির ধরন বদলেছে, খাদ্য সংরক্ষণের পদ্ধতিও আধুনিক হয়েছে। এসব পরিবর্তন জীবনকে সহজ করেছে। তবু কৃষকের ঘামে ফলানো ধানের প্রতি শ্রদ্ধা, মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং ফসল ঘরে তোলার আনন্দ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গ্রামবাংলার সন্ধ্যার একটি নিজস্ব সৌন্দর্য ছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে গেলে ধীরে ধীরে নেমে আসত অন্ধকার। পাখিরা ফিরত বাসায়, মাঠ থেকে গরু ফিরিয়ে আনতেন রাখাল, বাড়িতে বাড়িতে জ্বলে উঠত আলো। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসত মাগরিবের আজান।
খেলাধুলায় মগ্ন শিশুরা অনেক সময় বাড়ি ফেরার ডাক শুনেও ফিরতে চাইত না। মা কিংবা বড়দের কণ্ঠে বারবার শোনা যেত—এবার বাড়ি আয়, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কখনো সেই ডাকের সঙ্গে থাকত শাসন, কখনো উদ্বেগ, কখনো নিখাদ স্নেহ।
আজানের ধ্বনি, পাখির ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ এবং দূরের বাড়িগুলোর আলো মিলিয়ে সন্ধ্যার পরিবেশ হয়ে উঠত অপূর্ব। বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসা, পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়া—দিনের এই পরিচিত ছন্দ শিশুদের জীবনে নিয়ম ও শৃঙ্খলা তৈরি করত।
সন্ধ্যা ছিল দিনের ব্যস্ততা থেকে পরিবারের কাছে ফিরে আসার সময়। প্রতিবেশীদের মধ্যে খোঁজখবর নেওয়া, অসুস্থ কারও বাড়িতে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক অভ্যাসও ছিল অনেক এলাকায়।
আজও সন্ধ্যা নামে, আজান শোনা যায়, পাখিরা বাসায় ফেরে। কিন্তু অনেকের জীবনে সেই সম্মিলিত পারিবারিক সময় কমে এসেছে। তাই সন্ধ্যার এই পুরোনো সৌন্দর্য আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—দিনের শেষে প্রিয়জনদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও জীবনের বড় প্রাপ্তি।
শৈশবের মাঠ ছিল এমন এক বিদ্যালয়, যেখানে বইয়ের বাইরে জীবনের বহু শিক্ষা পাওয়া যেত। ফুটবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, কাবাডি কিংবা দৌড় প্রতিযোগিতা—খেলার ধরন ছিল নানা রকম। মাঠে জিতলে আনন্দ, হারলে সাময়িক মন খারাপ; কিন্তু পরের খেলায় আবার নতুন করে চেষ্টা করার সুযোগ থাকত।
খেলতে গিয়ে শিশুরা শিখত দলগত কাজ, নিয়ম মেনে চলা, নেতৃত্ব, ধৈর্য ও পরাজয় মেনে নেওয়া। কখনো ঝগড়া হতো, কখনো ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতো। কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার আগেই অধিকাংশ বিরোধ মিটে যেত। বন্ধুরা আবার একই দলে খেলত। অনেক জায়গায় স্কুল ছুটির পর কিংবা বিকেলে মাঠে ছেলেমেয়েদের ভিড় জমত। খেলার উপকরণ না থাকলেও আনন্দ থেমে থাকত না। কখনো কাপড়ের বল, কখনো কাঠের তৈরি ব্যাট, কখনো নিজেরাই বানানো খেলনা দিয়ে চলত খেলা।
বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মাঠ দখল এবং নিরাপদ খেলার জায়গার অভাব শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের অনেক শিশু দিনের বড় অংশ ঘরের ভেতর কাটায়। পড়াশোনার চাপ ও পর্দানির্ভর বিনোদনও তাদের শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
শিশুদের জন্য নিরাপদ মাঠ, উন্মুক্ত পার্ক এবং খেলাধুলার পরিবেশ নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত জরুরি। কারণ খেলা নিছক সময় কাটানোর বিষয় নয়; এটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মা-বাবার শাসন, আদর আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা
শৈশবের স্মৃতিতে মা-বাবার উপস্থিতি সবচেয়ে গভীর। মায়ের হাতের খাবার, অসুস্থ হলে কপালে হাত রেখে জ্বর দেখা, রাতে ঘুম পাড়ানোর গান কিংবা স্কুলে যাওয়ার আগে পোশাক ঠিক করে দেওয়া—এসব সাধারণ ঘটনা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিতে পরিণত হয়।
বাবার হাত ধরে বাজারে যাওয়া, সাইকেলের সামনে বা পেছনে বসে ঘুরতে যাওয়া, নতুন বই কিনে আনার আনন্দ কিংবা বিপদের সময় বাবার দৃঢ় উপস্থিতি শিশুমনে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করত।
কখনো দুষ্টুমি করলে শাসন জুটত। পড়াশোনায় অবহেলা করলে বকুনি শুনতে হতো। কিন্তু সেই শাসনের আড়ালে থাকত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। বড় হওয়ার পর মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারে, যে বকুনিকে একসময় অন্যায় মনে হয়েছিল, তার পেছনেও ছিল ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ।
পরিবারের আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক, মা-বাবার আন্তরিক চেষ্টা সন্তানদের জীবনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাঁরা নিজেদের অনেক ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জন্য বই, পোশাক, খাবার ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। সন্তান বড় হয়ে যখন নিজের জীবনের ব্যস্ততায় ডুবে যায়, তখন শৈশবের সেই ত্যাগের মূল্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করে।
ফেলে আসা শৈশবের দিকে ফিরে তাকালে তাই শুধু খেলা বা বিনোদনের কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে সেই মানুষগুলোর কথা, যাঁদের ভালোবাসা আমাদের বেড়ে ওঠার ভিত্তি তৈরি করেছে।
সময় পরিবর্তিত হয়েছে, আর সেই সঙ্গে বদলেছে শৈশবের ধরনও। আগে শিশুরা বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলত, গাছের ডালে উঠত, পুকুরপাড়ে বসে গল্প করত। এখন অনেক শিশুর অবসর কাটে মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার কিংবা ভিডিও গেমে।
শৈশবের স্মৃতি কখনো শুধু ব্যক্তিগত থাকে না অনেক সময় তা হয়ে ওঠে একটি সময়ের সামাজিক ইতিহাস। হারিকেনের আলো, ডাকপিয়নের চিঠি, হাটের দিন, মাটির কলসি কিংবা ধানের গোলার গল্প আমাদের জানায়, একসময় মানুষের জীবন কীভাবে চলত। এসব স্মৃতির মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে পারিবারিক সম্পর্ক, গ্রামীণ অর্থনীতি, লোকজ সংস্কৃতি এবং সামাজিক যোগাযোগের ধরন।
যাঁরা সেই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে বেঁচে আছেন, তাঁদের স্মৃতিচারণ নতুন প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছে পুরোনো দিনের গল্প শোনা, পারিবারিক ছবি সংরক্ষণ করা, গ্রামের ইতিহাস লেখা কিংবা স্থানীয় ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে অতীতের অনেক মূল্যবান তথ্য ধরে রাখা সম্ভব।
স্মৃতি সংরক্ষণের অর্থ শুধু পুরোনো দিনের প্রতি আবেগ প্রকাশ নয় এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, সমাজ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং কোন মূল্যবোধগুলো আজও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের সবকিছু নিখুঁত ছিল না, যেমন বর্তমানের সবকিছু ত্রুটিপূর্ণ নয়। কিন্তু অতীতের সরলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রকৃতিনির্ভর জীবন ও আন্তরিক সম্পর্ক থেকে শিক্ষা নেওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে।
একটি শিশুর কাছে হয়তো আজ স্মার্টফোনই সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু। কিন্তু সেই শিশুকে যদি গ্রামের নদীর পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়, গাছের নিচে বসে গল্প শোনানো হয়, হাতে মাটির খেলনা দেওয়া হয় কিংবা পরিবারের সঙ্গে পিঠা তৈরিতে অংশ নিতে দেওয়া হয়, তাহলে সেও তৈরি করতে পারে নিজস্ব আনন্দের স্মৃতি।
শৈশবের সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট যুগের একচেটিয়া সম্পদ নয়। ভালোবাসা, নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ এবং কৌতূহল মেটানোর পরিবেশ থাকলে প্রতিটি প্রজন্মই তার নিজস্ব সোনালি দিন তৈরি করতে পারে।
ফেলে আসা শৈশব আর কখনো ফিরে আসবে না। সেই হারিকেনের আলো হয়তো অনেক বাড়ি থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে, গাছতলার আড্ডা অনেক জায়গায় থেমে গেছে, ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টাও আর আগের মতো শোনা যায় না। মাটির কলসি, ধানের গোলা, কাগজের নৌকা কিংবা শীতের সকালে খেজুরের রস—এসবের অনেক কিছুই এখন মানুষের স্মৃতির পাতায় বেশি জীবন্ত।
তবু শৈশব হারিয়ে যায় না। জীবনের প্রতিটি বয়সে তার কোনো না কোনো চিহ্ন থেকে যায়। পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে, মায়ের হাতের কোনো খাবারের গন্ধ পেলে, দূরের নদী দেখে কিংবা সন্ধ্যার আজান শুনে হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা।
মনে পড়ে, তখন সুখী হওয়ার জন্য কত কম কিছু প্রয়োজন হতো! একটি নতুন বই, একটি ছোট্ট খেলনা, বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলবেলা, মায়ের ডাকে বাড়ি ফেরা—এসবেই জীবন পূর্ণ হয়ে উঠত। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা হয়তো অনেক কিছু অর্জন করি, কিন্তু সেই সরল আনন্দের কিছু অংশ হারিয়ে ফেলি।
আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে তাই মাঝে মাঝে থামা দরকার। নিজের শৈশবের দিকে ফিরে তাকানো দরকার। মনে করা দরকার, যে মাঠে খেলেছি, যে গাছের নিচে গল্প করেছি, যে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখেছি, সেসব আমাদের জীবনের অংশ। পাশাপাশি বর্তমান শিশুদের জন্যও এমন স্মৃতি তৈরির সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের হাতে শুধু স্মার্টফোন নয়, বই তুলে দিতে হবে; শুধু ঘরের নিরাপত্তা নয়, নিরাপদ খেলার মাঠ দিতে হবে; শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলের প্রত্যাশা নয়, হাসি, আনন্দ, প্রকৃতি ও বন্ধুত্বের সময়ও দিতে হবে।
কারণ শৈশব কেবল জীবনের প্রথম অধ্যায় নয়—এটি মানুষের মন গড়ে ওঠার ভিত্তি। এই অধ্যায়ে জমে থাকা স্মৃতিই পরবর্তী জীবনের ক্লান্ত সময়ে আশ্রয় হয়ে ওঠে।
দিন বদলাবে, মানুষ বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে। কিন্তু শৈশবের প্রতি মানুষের মমতা কখনো ফুরাবে না। জীবনের যত দূরেই যাই না কেন, হৃদয়ের কোনো এক নির্জন কোণে আমরা সবাই সেই ছোট্ট শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখি, যে একদিন হারিকেনের আলোয় পড়তে বসেছিল, গাছতলায় বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করেছিল, কাগজের নৌকা ভাসিয়েছিল আর সন্ধ্যার আজান শুনে মায়ের ডাকে বাড়ি ফিরেছিল। সেই শিশুটিই আমাদের সবচেয়ে আপন পরিচয়। আর ফেলে আসা শৈশব—সময়ের কাছে হারিয়ে গেলেও হৃদয়ের কাছে চিরকাল অমলিন, চিরকাল সোনালি।
লেখক পরিচিতি : উজ্জ্বল হোসাইন, লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক।

 

সর্বাধিক পঠিত