• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • রোববার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৫ মাঘ ১৪৩২
  • ||
  • আর্কাইভ

অনলাইনে কী এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎই না অপেক্ষা করছে এই মানবজাতির জন্যে!

প্রকাশ:  ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:১৪
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

কথিত সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি ফটোকার্ডের শিরোনাম :
১. সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে পদত্যাগ করলেন ড. ইউনূস।
২. প্রবাসে থেকেই আমি নির্বাচনে অংশ নেব : তারেক রহমান।
৩. ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন না দিলে আওয়ামী লীগকে সাথে নিয়ে আন্দোলন শুরু করব : সালাউদ্দিন।
৪. বিরোধী দল থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগ না দিলে নির্বাচনে যাব না : জামায়াত আমির।
এর একটিও সত্য খবর নয় এবং যেসব মাধ্যমে এই খবরগুলো এসেছে, তার একটিও দেশের প্রচলিত সংবাদমাধ্যম নয়। এগুলোর নাম কামবেলা, প্রথম আলু, জনকষ্ট, চেন্নাই টোয়েন্টিফোর, জানিনা টিভি ইত্যাদি। অর্থাৎ মূলধারার টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের আদলে ডিজাইন করে ভুল, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ফটোকার্ড বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অসংখ্য মানুষ তা বিশ্বাস করছে। কারণ প্রথম দেখায় এটা বুঝতে পারা কঠিন যে, আসলেই এসব ফটোকার্ড ভুয়া নাকি সঠিক।
শুধু তাই নয়, মূলধারার পত্রিকা বা টিভির হুবহু নাম, লোগো ও ডিজাইনেও এরকম ভুল ও বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে মানুষ বিশ্বাস করছে। ভাইরাল হওয়ার পরে জানা যাচ্ছে সেটা ফেইক। অর্থাৎ ফেইক ফটোকার্ডের মহামারি শুরু হয়েছে—যা সমাজে তৈরি করছে অস্থিরতা। মূলধারার সংবাদমাধ্যম পড়ছে চ্যালেঞ্জের মুখে।
চ্যানেল ওয়ানের লোগো ও ডিজাইন কপি করে একটি ফটোকার্ডে লেখা হয়েছে, ‘জামাত শিবিরের গুপ্ত লীগ ওসমান হাদিকে গুলি করেছে।’ অথচ চ্যানেল ওয়ান এরকম কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। ‘বোনকে সঙ্গে নিয়ে মির্জা ফখরুলের জন্য দোয়া করলেন শেখ হাসিনা’—এই শিরোনামে একটি ফটোকার্ড বানানো হয়েছে প্রথম আলোর লোগো দিয়ে। এটিও ভুয়া। কিন্তু প্রথম দেখায় খুব কম লোকই এটাকে সন্দেহ করবেন। কালবেলা পত্রিকার হুবহু নাম, লোগো ও ডিজাইনে বানানো একটি ফটোকার্ডে প্রধান উপদেষ্টার উদ্ধৃতি নিয়ে লেখা হয়েছে, ‘২০২৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই’। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন এ রকম অসংখ্য গুজব ও বিভ্রান্তি পরিবেশিত হচ্ছে সংবাদের মোড়কে। শুধু তাই নয়, এরকম ভুয়া, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচারকারী কোনো কোনো পেইজ তাদের ফলোয়ার সংখ্যা বাড়লে সেটি নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেয়। যেমন জানিনা টেলিভিশনের লোগো সম্বলিত একটি ফটোকার্ডে লেখা হয়েছে : জানিনা টেলিভিশন ১০ হাজারের পরিবার।
বলা হয়, বাংলাদেশে যত দ্রুত স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ হয়েছে, ওই তুলনায় যথেষ্ট পিছিয়ে আছে ডিজিটাল লিটারেসি। যে কারণে কোনটা খবর আর কোনটা গুজব; কোনটা জনকণ্ঠ আর কোনটা জনকষ্ট; কোনটা যমুনা টিভি আর কোনটা জানিনা টিভি—সেটি প্রথম দর্শনে অনেকেই ঠাওর করতে পারেন না। না পেরে তিনিও ওই ‘খবর’ বিশ্বাস করে নিজের ফেইসবুক ওয়ালে শেয়ার করেন। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাই এভাবে বিভ্রান্তির মোড়কে ছড়িয়ে পড়ে লাখ লাখ বা কোটি কোটি মানুষের মধ্যে। এটা এখন আর নিরব নয়, বরং সরব মহামারী। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে একটি অবিশ্বাসী বা ‘ফেইক প্রজন্ম’।
অসংখ্য মানুষ ফেইসবুককে সংবাদমাধ্যম মনে করে। তারা পরস্পরের আলাপচারিতায় বলে, “দেখেন তো খবরটা ফেসবুকে দিছে কি না।” অথচ ফেসবুক যে খবরের জায়গা নয়, এই সাধারণ জ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞান তৈরির আগেই মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে ইন্টারন্টে সংযুক্ত স্মার্টফোন ও ফেসবুক।
মূলধারার টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের আদলে ডিজাইন করে ভুল, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ফটোকার্ড বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। প্রথম দেখায় এটা বোঝা কঠিন যে, আসলেই এসব ফটোকার্ড ভুয়া নাকি সঠিক।
মূলধারার টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের আদলে ডিজাইন করে ভুল, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ফটোকার্ড বানিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। প্রথম দেখায় এটা বোঝা কঠিন যে, আসলেই এসব ফটোকার্ড ভুয়া নাকি সঠিক।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা করা তথা দৃশ্যত শিক্ষিত মানুষজনও কোনটা খবর, কোনটা বেখবর, কোনটা প্রোপাগান্ডা, কোনটা গুজব—সেটি বুঝতে পারে না। পারার কথাও নয়। কারণ এই শিক্ষাটা তিনি পাননি। যে কারণে ফেসবুকে কে কী লিখলেন, কে প্রোফাইল লাল বা কালো করলেন, কে কার ছবিতে লাইক ও কমেন্ট করলেন—এসব দিয়েই একজন মানুষ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। অথচ ফেসবুক পোস্ট বা কমেন্টই যে একজন মানুষকে বোঝা বা তাকে বিচার করার একমাত্র উপায় নয়; বরং ভার্চুয়াল দুনিয়ার বাইরেও যে প্রত্যেকের একটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবন রয়েছে; ফেসবুকের বাইরেও যে তিনি আরেকজন স্বতন্ত্র মানুষ—ওই চিন্তাটা অনেকেই করেন না। করতে চান না।
প্রায়শই অফিসের লিফটে খেয়াল করি, শিক্ষিত সচেতন বলে মনে হয় এমন মানুষেরাও মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে স্ক্রল করতে করতে এসব বিভ্রান্তিকর খবর, গুজব ও ফেইক ফকোটকার্ড বিশ্বাস করে আরেকজনকে বলছেন। যার সঙ্গে বলছেন তিনিও বিশ্বাস করছেন। কিন্তু কালবেলা যে কামবেলা, আর যমুনা টিভি যে আনোয়ার টিভি হয়ে গেছে, সেটা হয়তো অনেকেই খেয়াল করছেন না বা এটুকু খেয়াল করার মতো সচেতনতাও হয়তো তার নেই। সমাজের শিক্ষিত মানুষের যখন এই দশা, তখন ইন্টারনেট সংযুক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারকারী একজন দিনমজুর বা কম পড়ালেখা জানা মানুষের বিভ্রান্ত হওয়া কতটা সহজ—তা সহজেই অনুমেয়।
সোশ্যাল মিডিয়ার শেয়ার করা বিভ্রান্তিকর, অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ কনটেন্টের আরেকটা বড় সমস্যা হলো, কোনো একজন ব্যক্তির অনেক কথার মাঝখান থেকে একটি বা দুটি লাইন নিয়ে কনটেন্ট বানিয়ে সেটি ছড়িয়ে দেয়া হয়। তার ফলে ওই বক্তব্যের আগে পরে কী আছে, সেটা মানুষ জানে না। অনেক সময় কারও বক্তব্যের খণ্ড খণ্ড অংশ জোড়া দিয়ে এমন একটি বাক্য তৈরি করা হয়, যে কথা আদৌ ওই ব্যক্তি বলেননি। বিশেষ করে রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্টজন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। ফলে ওইসব বক্তব্য নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়। এই প্রবণতা শুধু ভুয়া সংবাদমাধ্যমের নয়, বরং অনেক সময় কোনো কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমও এইধরনের কাটপিস তৈরি করে বেশি ভিউয়ের নেশায়।
কোনো সমাজে যখন খবর আর গুজব এক হয়ে যায়, যখন সমাজের বিরাট অংশের মানুষ গুজবকে খবর বলে বিশ্বাস করে, তখন সেখানে প্রথম চোটে মার খায় ইথিক্যাল জার্নালিজম বা নীতিবান সাংবাদিকতা। দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে যখন সকল সত্যকেই মিথ্যা এবং সকল মিথ্যাকেই সত্য বলা হয়, তখন মানুষ সবই বিশ্বাস করে এবং সবই অবিশ্বাস করে। সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ কিংবা বিরোধী দল থেকে উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে জামায়াতের দাবিসম্বলিত ফটোকার্ডকেও মানুষ সংবাদ বলে মনে করে এবং সেটি  চায়ের দোকানে, অফিসে বা সামাজিক আলাপচারিতায় আলোচিত হয়।
এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে ভিউ বাণিজ্য। যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পেইজ মনিটাইজড হয়ে গেলেই সেখান থেকে টাকা আসে, আর যে কনটেন্টের যত বেশি ভিউ তত বেশি টাকা, অতএব ভিউয়ের নেশায় ছুটছে পুরো সোশ্যাল মিডিয়া। তবে এটা ঠিক যে, ভিউয়ের নেশায় মূলধারার সংবাদমাধ্যমও পিছিয়ে নেই। অনেক পত্রিকা ও টেলিভিশনও চটকদার শিরোনাম আর বিভ্রান্তির খবর পরিবেশ করে বেশি ভিউয়ের আশায়। যার ফলে যেসব সংবাদমাধ্যম প্রকৃতই বস্তুনিষ্ঠ ও ইথিক্যাল জার্নালিজমের চর্চা করে, তারা অনেক সময় বাণিজ্যিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। ফলে একসময় তারাও এই ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়।
শুধু সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ডই নয়, বরং রাজনৈতিক দলের প্যাডে কোনো ঘোষণা বা বার্তা দিয়ে সেগুলোও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। যেমন গত বছরের ১১ নভেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে জানান, কোনো স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল তার স্বাক্ষর জাল করে ফেসবুকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি পোস্ট করেছে, যা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা, বানোয়াট ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
যদিও সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত ফটোকার্ডগুলোর মধ্যে কোনটি আসল আর কোনটি ফেইক, সেটি বোঝা হয়তো খুব কঠিন নয়। একটু ভালো করে কার্ডগুলো খেয়াল করলে হয়তো এর ফাঁকফোকর ধরা সম্ভব। কিন্তু সেই ন্যূনতম সচেতনতার বোধ কত শতাংশ মানুষের আছে সেটি যেমন প্রশ্ন, তেমনি মানুষ আদৌ ফটোকার্ডের সত্যমিথ্যা যাচাই করতে চায় কি না, সেটিও প্রশ্ন। কেননা, বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া ফটোকার্ডগুলো বানানো হয় মানুষ যা শুনতে চায়, এমন সব বিষয়ে। ফলে সে যখন ভুল ও ভুয়া খবরও দেখে, সে এটা এনজয় করে। শেয়ার করে। কিন্তু তার এই মেনে নেয়া ও নির্ভারতাই ভুয়া সংবাদমাধ্যমগুলোর সাবস্ক্রাইবার ও ভিউ বাড়াতে সহায়তা করে। মানুষের এই বোকামি, উন্মাদনা, উন্নাসিকতা, অশিক্ষা ও অসচেনতনার সুযোগ নিয়ে একটি পক্ষ টাকা কামাচ্ছে। অন্যদিকে সমাজে বাড়ছে বিভ্রান্তি। বিভেদ।
গত ১৫ নভেম্বর বিবিসির সাংবাদিক মিজানুর রহমান ফেসবুকে লিখেছেন, এআই দিয়ে তো আজকাল সবই করা সম্ভব। একটা স্টিল ছবি দিলে ভিডিও বানিয়ে দেয়। এমনকি, ব্যাংক নোটে দোয়েল পাখির ছবি পাখা ঝাপটায়, কৃষকরা পানিতে পাট ধুয়ে নেয়! এসব দেখতে দেখতে ভাবি, কী এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎই না অপেক্ষা করছে এই মানবজাতির জন্য। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। ভালো হোক মন্দ হোক এই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে নিতেই হবে। আর পেছনে ফেরা যাবে না। মানুষ যদি এই প্রযুক্তিকে ঠিকভাবে ব্যবহার করে, তাহলে সভ্যতার আরও উন্নতি হবে। সেরকম না হলে এই এআই-এর কাছেই পরাজয় ঘটবে মানুষের। (সূত্র : বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম)