• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ৫ আষাঢ় ১৪২৮
  • ||
  • আর্কাইভ

শাহরাস্তির অহংকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লে. আনোয়ার হোসেন, বীর উত্তম এর জন্মদিন আজ

জাতির সূর্য সন্তান শাহরাস্তির অহংকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লে. আনোয়ার হোসেন, বীর উত্তম এর ৭৩ তম জন্মদিন আজ। (জন্ম: মে ৫, ১৯৪৮; মৃত্যু ২৬ জুলাই, ১৯৭১) স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর উত্তম খেতাব প্রদান করে।

প্রকাশ:  ০৫ মে ২০২১, ১৮:০৪ | আপডেট : ০৫ মে ২০২১, ২২:৫৯
ইউসুফ পাটোয়ারী লিংকন
প্রিন্ট

শাহরাস্তির অহংকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লে. আনোয়ার হোসেন, বীর উত্তম এর জন্মদিন আজ

ইউসুফ পাটোয়ারী লিংকন

জাতির সূর্য সন্তান শাহরাস্তির অহংকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা লে. আনোয়ার হোসেন, বীর উত্তম এর ৭৩ তম জন্মদিন আজ। (জন্ম: মে ৫, ১৯৪৮; মৃত্যু ২৬ জুলাই, ১৯৭১) স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর উত্তম খেতাব প্রদান করে।

জন্ম ও শিক্ষাজীবনঃ- মো. আনোয়ার হোসেনের বাড়ি চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার সোনাইমুড়ি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ৫ মে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁর বাবার নাম আবদুল হক এবং মায়ের নাম নূরজাহান বেগম।

কর্মজীবনঃ- ১৯৭১ সালের মার্চে মো. আনোয়ার হোসেন প্রশিক্ষণে ছিলেন। প্রশিক্ষণে থাকার কারণে দেশের পরিস্থিতির খবর সময়মতো পেতেন না। ১৪ মার্চ তাঁর আত্মীয় ওয়াকার হাসান ( বীর প্রতীক ) গিয়েছিলেন যশোরে। তখন তিনি প্রশিক্ষণ থেকে এক দিনের ছুটি নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ইচ্ছা ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে চাকরি করার। পাকিস্তান শাসনামলে সেনাবাহিনীতে অফিসার্স কোর্সে বাঙালি কেউ যোগ দিলেই তাঁকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে দেওয়া হবে, নিশ্চয়তা ছিল না। কোর্সে যাঁরা সবচেয়ে ভালো করতেন, তাঁদেরই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে নিয়োগ পেতেন। আনোয়ার হোসেন এইচএসসি পাস করে ১৯৬৯ সালে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৩ অফিসার্স শর্ট কোর্সে। এতে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে কমিশন পান। ১৯৭০ সালে তাঁকে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ- ১৯৭১ সালে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল যশোর সেনানিবাসে। এ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন বাঙালি রেজাউল জলিল। অফিসারদের মধ্যে হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ (বীর বিক্রম) ও মো. আনোয়ার হোসেন ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন পাকিস্তানি। ১৯৭১ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হতে থাকলে তাঁদের রেডিও শোনা নিষিদ্ধ করা হয়। এ সময় আবার এই ব্যাটালিয়নের অর্ধেক যশোরের প্রত্যন্ত এলাকায় প্রশিক্ষণে, অর্ধেক ছুটিতে ছিলেন।

২৫ মার্চ মো. আনোয়ার হোসেনও ছিলেন প্রশিক্ষণস্থলে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের খবর তাঁরা সময়মতো পাননি। ২৮ বা ২৯ মার্চ অধিনায়ক রেজাউল করিম নির্দেশ দেন তাঁদের অবিলম্বে সেনানিবাসে ফেরার। সেদিনই তাঁরা সেনানিবাসে আসেন। সেনানিবাসে আসার পর রেজাউল করিম সবাইকে অস্ত্র জমা দিতে বলেন। তাঁর নির্দেশে তাঁরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও অস্ত্র জমা দেন। সেদিন তাঁরা বেশির ভাগ ছিলেন ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত। এ জন্য তাঁরা রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে যশোর সেনানিবাসে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বালুচ ও ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট তাঁদের আক্রমণ করে। নিরস্ত্র সৈনিকদের কয়েকজন ঘুমন্ত অবস্থাতেই শহীদ হন। বেঁচে যাওয়া সৈনিকেরা অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ শুরু করেন। সৈনিকেরা অধিনায়ক রেজাউল জলিলকে অনুরোধ জানান বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়ার। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন সৈনিকদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় একাত্মতা প্রকাশ করেন। তাঁদের নেতৃত্বে সৈনিকেরা বীরত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানিদের মোকাবিলা করতে থাকেন। হাফিজ উদ্দিন ও আনোয়ার হোসেন এই অসম যুদ্ধে অসাধারণ বীরত্ব ও সাহস প্রদর্শন করেন। তাঁদের সাহস ও বীরত্বে প্রতিরোধ যোদ্ধাদেরও মনোবল বেড়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলে। এর মধ্যে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অনেকে শহীদ ও অনেকে আহত হন। একপর্যায়ে তাঁদের গোলাগুলিও কমে আসতে থাকে। এ অবস্থায় হাফিজ ও আনোয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সেনানিবাস এলাকা ছেড়ে চৌগাছায় একত্র হওয়ার। এরপর তাঁরা ফায়ার অ্যান্ড মুভ পদ্ধতিতে খোলা মাঠ দিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকেন। আনোয়ারও সেভাবে পশ্চিম দিকের খোলা মাঠ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেশিনগানে ছোড়া গুলি এসে লাগে আনোয়ার হোসেনের কোমর ও পিঠে। গুলির আঘাতে সঙ্গে সঙ্গে তিনি শহীদ হন। প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে নেন। সেখানে স্থানীয় জনগণ তাঁকে নজরুল ইসলাম কলেজের সামনে সমাহিত করেন।

আনোয়ার হোসেনের সাহসিকতা এবং ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিরাপত্তায় বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীরউত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে। তাঁর নামানুসারে ঢাকা সেনানিবাসের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয়েছে ‘শহীদ বীরউত্তম লে. আনোয়ার গার্লস স্কুল ও কলেজ’। জাতির এই সূর্য সন্তানদের আমরা মনে করি কালে ভদ্রে আমাদের এই গর্বের মানুষদের মনে করা উচিত আমাদের প্রতিটি কাজে।

বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই হে বীর। যে জীবন দিয়ে আমাদের এনে দিয়েছো একটি মানচিত্র ও লাল-সবুজের পতাকা আমরা তোমাদের অবদানের কথা কখনো ভুলবোনা ।

সর্বাধিক পঠিত