• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||
  • আর্কাইভ

ব্রেকিং নিউজ

করোনা আমাদের যে শিক্ষাগুলো দিয়ে যাচ্ছে

প্রকাশ:  ১৪ মে ২০২০, ০৩:৩৬
অধ্যক্ষ রতন ‍কুমার মজুমদার
প্রিন্ট

আমাদের জানার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে শেখার অনেক বাকী আছে। বাংলাদেশে করোনা হানা দিয়েছে আজ প্রায় ৩ মাস। এই তিন মাসে আমরা যা শিখেছি তা এক যুগের শিক্ষাকে ছাড়িয়ে যাবে। সে শেখাগুলো ব্যতিক্রমি শিক্ষা । যে শিক্ষাগুলো আমরা করোনা থেকে পেলাম সীমিত আকারে তুলে ধরবার চেষ্টা করছি।

১। গত তিন মাসে করোনা আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে ঘরে বসে থাকলেও বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এক সময় এই কথাটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও আজ তা সত্যি রুপেই দেখা দিয়েছে। বুঝিয়ে দিচ্ছে ঘরে কত সুখ! পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করেছে করোনা।

২। করোনা আমাদের অসাম্প্রদায়িকতা শিক্ষা দিয়ে গেল। হিন্দু মুসলিমকে এক কাতারে এনে দিয়ে গেল। ধর্মীয় বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আমরা মানবতার শিক্ষা নিয়েছি করোনা থেকে। হিন্দুর মরদেহ সৎকার করছে আমার মুসলমান ভাই । এটি আমাদের এক জনমের শিক্ষা। সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ ভুলে আমরা একে অপরের পাশে দাড়িয়েছি মানুুষের চরিত্র নিয়ে।

৩। করোনা আমাদের শিখিয়ে গেল মহামারির কাছে ধনী গরীবের কোন ভোদাভেদ নেই। এটি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল। সমাজে কোন শ্রেনীর লোকের বেশি প্রয়োজন তাও বুঝিয়ে দিচ্ছে। অর্থের পিছনে পাগলের মতো ছুটতে থাকা লোকটাও আজ বুঝে গেছে নিজের ভবিষ্যৎ, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নূন্যতম কি প্রয়োজন, সুখে সাচ্ছন্দে বেঁচে থাকার জন্য আমরা যে ভাবে ছুটছি এত ছোটার প্রয়োজন নেই, জীবনে এত কিছুর প্রয়োজন নেই।

৪। করোনা আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেল আমাদের স্বাস্থ্য সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্য সচেতন বা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে বাঁচা কঠিন কাজ নয়! বলে দিয়ে গেল খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। নতুবা নিজেকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপখাওয়ানোর মত নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।

৫। করোনা আমাদের মানবতার শিক্ষা দিয়ে গেল। কোথায় স্বর্গ
কোথায় নরক কে বলে তাহা বহু দুর , মানুষের মাঝে স্বর্গ নরক মানুষেতেই সুরাসুর। অন্যের বিপদের সময় কিভাবে পাশে দাড়াতে হয় সে শিক্ষাটা শিখিয়ে দিল। আরো শিক্ষা দিল প্রীতি ও প্রেমের পূণ্য বাঁধনে যবে মিলি পরষ্পরে, স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরি কুঁড়ে ঘরে।

৬। করোনা আমাদের (সোশাল ভ্যালুজ) সামাজিক মূল্যবোধ শিক্ষা দিয়ে গেল। প্রতিবেশী ছাড়া নিজের জীবন বৃথা সেটা শিক্ষা দিয়ে গেল। সমাজের একজন হিসেবে প্রত্যেকেরই কিছু দায়িত্ববোধ আছে সেটা জানিয়ে গেল। মানুষের বিপদের সময় কিভাবে মানুষের পাশে দাড়াতে হয় সে শিক্ষাটা দিয়ে গেল। নিজেকে ত্যাগ স্বীকার করার পাঠ দিয়ে গেল। আত্মকেন্দ্রীকতা থেকে বের হয়ে আসার চরম শিক্ষা দিয়ে গেল।

৭। চিকিৎস , স্বাস্থ্যকর্মী ,পুলিশ ভাইরা যে জীবনের জন্য অপরিহার্য
সে শিক্ষাটা করোনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল। আমরা যেন কোনদিনই তাদেরকে অবহেলা বা অবজ্ঞার চোখে না দেখি সে পাঠ দিয়ে গেল। বিপদের সময় এরাই প্রকৃত বন্ধু সেটা জানান দিয়ে গেল। অতএব তাদেরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখ।

৮। সেই সব বাবা ও মায়েদের শিক্ষা দিয়ে গেল এবার ,
আমার বাচ্চা অমুক ব্র্যান্ড ছাড়া খাবার খায় না, অমুক রেস্টুরেন্ট ছাড়া যায় না ,তাদের জন্য করোনার কঠোর শিক্ষা। অহংকারীদের মাটিতে নামিয়ে এনেছে করোনা।

৯। করোনা এসে প্রকৃত শিক্ষিত ও অশিক্ষিত দুইয়ের মধ্যে প্রভেদ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কিছু লোকের যে দাম্ভিকতা ছিল তা দুর করে দিয়ে গেল। বিপদের দিনে দূরের যে মানুষটিকে কাজের ভিড়ে মনে পড়ত না, সে বিপদের সময় সবার আগে ফোন করে যখন খবর নেয় তখন আপন পর চেনার পাঠ দিয়ে গেল।

১০। চেনা ছকের বাইরে গিয়ে চির প্রতিদ্বন্দ্বী শাশুড়ি ও বৌমা কাঁধ মিলিয়ে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে,তারা এখন সহযোদ্ধা, আগে প্রাণ বাঁচুক,তাহলে ঝগড়া বেঁচে থাকবে। এটি করোনার করিশ্মাই বলতে হয়। পারিবারিক বন্ধনটাকে সুতায় বেধে দিয়ে গেল।

১১। বাড়ীর কাজের লোকটি যে কত গুরুত্বপূর্ণ যাকে আমরা এতদিন অবহেলার চোখে দেখতাম , ছুটি চাইলে ছুটি দিতাম না । আজ দীর্ঘ
সময়ে ছুটি আমাদের জানিরয়ে দিয়ে গলে সে কতটা পরিশ্রম করতো। তার ছুটি, তার সুস্থ থাকা, বিশ্রাম আমরা কতটুকু ভাবি বা জানি, করোনার করুণায় সে ছুটি পেল, বিশ্রাম ও পেল।

১২। এ ভূখন্ডের মালিক যে শুধু আমরা নই তা বুঝিয়ে দিয়ে গলে করোন। যখন দেখি কক্সবাজার সৈকতে ডলফিনের আনাগোন , সৈকতে চিত্রল হরিনের বিচরণ , কোকিলে ডাক , পাখির কলোতানে আমাদের ঘুম ভাঙ্গে। এরাও যে প্রকৃতির অংশ ,তাদেরও যে সমঅধিকার আছে তা জানিয়ে দিয়ে গেল। প্রকৃতি কত সুন্দর হতে পারে , কত দুষণমুক্ত ও নির্মল হতে পারে তা বুঝে নিলাম।

১৩। যে যুবসমাজকে নিয়ে এত কথা , যে যুবসমাজের একটি অংশ ছিল বিপথগামী করোনা তাদেরকে সঠিক নিশাণা দিল। যুবকরা যে ইচ্ছে করলে ভাল কিছু করতে পারে তা শিক্ষা দিয়ে গেল। আজ যুবকরাই আপনার আমার পাশে দাড়িয়ে বাঁচার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

১৪। সম্পর্ক গুলি ঝালিয়ে নেওয়ার এই সুযোগ করোনার অপ্রত্যাশিত ভাল দিক।করোনা শেখাল ,ভালবাসো পৃথিবীক। পৃথিবীর জীববৈচিত্রকে। মানুষের ঔদ্ধত্য, লাগামহীন জীবন, অসভ্যতা, প্রকৃতি মানলো না, প্রকৃতি জুরাসিক যুগে ডাইনোসরকেও সরিয়ে দিয়ে ছিল। আমরা ও শুধু একটা প্রজাতি মাত্র, প্রকৃতি র রোষে বিলুপ্তির পথে আমরাও যেতে পারি, কোনো দিন।

করোনা আমাদের অমানুষ থেকে মানুষ করলো আবার।
করোনা এবার তুমি যেতে পার। অনেক শিক্ষা পেয়েছি আমরা।
এবার তোমাকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত আমরা।

সূত্র : অধ্যক্ষ রতন ‍কুমার মজুমদারের ফেসবুক হতে নেয়া।