• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০২৩, ১৬ চৈত্র ১৪২৯
  • ||
  • আর্কাইভ

ফরিদগঞ্জে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কিসের ভারে ডুবলো নৌকা?

প্রকাশ:  ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:০৯
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

‘ধান নেই’ তাহলে কিসের ভারে ডুবলো নৌকা? ফরিদগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে এটি একটি বিরাট প্রশ্ন! ক্ষমতাসীন দলের এমন ভরাডুবি দলীয় প্রতীকের কারণে? নাকি দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে? দলীয় নেতা-কর্মীদের নীরব ভূমিকা? দলীয় প্রার্থীর আর্থিক দৈন্যতা? নাকি বিদ্রোহীদের কারণে? নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রায় নাকি সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছেন? নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই নির্বাচনী এলাকা, উপজেলা সদর এবং আশপাশের রাজনৈতিক সচেতন লোকদের আলোচনার বিষয়ই ছিলো এটি। এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন তারা। আর এ ইউনিয়নটি হচ্ছে ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৮নং পাইকপাড়া উত্তর ইউনিয়ন। 
ভোটের মাঠে সবসময় নৌকা ও ধানের শীষেই লড়াই হয়। এই নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক ছিলো না। সে ক্ষেত্রে নৌকা সহজেই জিতে যাওয়ার কথা। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে সাতজন প্রার্থীর মধ্যে নৌকার স্থান হলো চারে। জয়-পরাজয় থাকবে কিন্তু এমন পরাজয় মেনে নিতে পারছেন না আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা। তারা এই ভোট নিয়ে যতই বিশ্লেষণ করছেন ততই হতাশ হচ্ছেন। বিষয়টি তারা কিছুতেই মানতে পারছেন না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিরোধিতা অনেকেই করেছেন। এর কিছুটা প্রভাব পড়লেও খুব বেশি একটা সমস্যা হয়নি। বিগত নির্বাচনের ফলাফল এতো হতাশাজনক হয়নি। ‘নৌকা’ মোহাম্মদ হোসেন মিন্টুর প্রতীক নয়, এটা আওয়ামী লীগের প্রতীক। আর সেই নৌকার ভরাডুবি! ৯টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র একটি কেন্দ্রে পাস করেছে! বিজয়ী প্রতীক আনারস আর নৌকা প্রতীকের মধ্যে ভোটের ব্যবধান হলো ২, ১৮১। ভাবা যায়? নৌকা পেয়েছে ১,৩৮৮ ভোট, আনারস পেয়েছে ৩,৫৬৯ ভোট। 
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই ইউনিয়নের ১ ও ২নং ওয়ার্ডে কোনো নির্বাচনে নৌকা প্রতীক হারেনি। কিন্তু এই প্রথম এই ২টি ওয়ার্ডে ফেল করেছে নৌকা। তাও আবার বিশাল ভোটে। নৌকার এই সামান্য ভোট দেখে প্রকৃত আওয়ামী লীগাররা হতাশা প্রকাশ করেছেন। টানা ১৪ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরও এই হতাশাজনক ফলাফল মেনে নিতে পারছেন না তারা।
১নং ওয়ার্ডে ভোট কাস্ট হয়েছে ১৬৮০ ভোট, এর মধ্যে নৌকা পেয়েছে মাত্র ২৯ ভোট, টেলিফোন প্রতীক পেয়েছে সর্বোচ্চ ৫৫৮ ভোট। ২নং ওয়ার্ডে কাস্ট হয়েছে ১৭০৯ ভোট, এর মধ্যে নৌকা পেয়েছে ৭৩ ভোট, আনারস প্রতীক পেয়েছে সর্বোচ্চ ৫৭৩ ভোট। ৩নং ওয়ার্ডে কাস্ট হয়েছে ১৭৩০ ভোট, এর মধ্যে নৌকা পেয়েছে ৩৩ ভোট, টেলিফোন প্রতীক পেয়েছে সর্বোচ্চ ৮২৪ ভোট। ৪নং ওয়ার্ডে কাস্ট হয়েছে ৮৭৮ ভোট, এর মধ্যে নৌকা পেয়েছে ৭৪ ভোট, ঘোড়া প্রতীক পেয়েছে সর্বোচ্চ ৪৮৬ ভোট। ৫নং ওয়ার্ডে কাস্ট হয়েছে ১৪৭৬ ভোট, এর মধ্যে নৌকা পেয়েছে ৬০ ভোট, আনারস প্রতীক পেয়েছে সর্বোচ্চ ৮০৫ ভোট। ৬নং ওয়ার্ডে কাস্ট হয়েছে ১৬৪৫ ভোট, এর মধ্যে নৌকা পেয়েছে ৩৪৩ ভোট, আনারস প্রতীক পেয়েছে সর্বোচ্চ ৪৪২ ভোট। ৭নং ওয়ার্ডে কাস্ট হয়েছে ১২৯৩ ভোট, এর মধ্যে নৌকা পেয়েছে ৪৬৯ ভোট, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আনারস প্রতীক পেয়েছে ২৪৭ ভোট। ৮নং ওয়ার্ডে কাস্ট হয়েছে ৯১৮ ভোট, এর মধ্যে নৌকা পেয়েছে ১৩৮ ভোট, আনারস প্রতীক পেয়েছে সর্বোচ্চ ২৯৬ ভোট। ৯নং ওয়ার্ডে কাস্ট হয়েছে ১৩৪৬ ভোট, এর মধ্যে নৌকা পেয়েছে ১৬৯ ভোট, মোটরসাইকেল প্রতীক পেয়েছে সর্বোচ্চ ৪৪৩ ভোট।  
৮নং পাইকপাড়া উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ৬৫ সদস্য বিশিষ্ট, ৯টি ওয়ার্ডে ৫১ করে মোট সদস্য ৪৫৯ জন। এভাবে ইউনিয়ন যুবলীগ ও ওয়ার্ড যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা লীগ, যুব মহিলা লীগ, কৃষকলীগ শ্রমিকলীগ, ওলামালীগ ও ছাত্রলীগের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটিতে লোক রয়েছে সর্বমোট ৩২৫৪ জন। এর মধ্যে ছাত্রলীগ বাদ দিলে ২৯৩৩ জন কমিটিতেই আছেন। সাধারণ ভোটারের কথা না হয় বাদই দেয়া হলো। কমিটিতে এতো লোক থাকতে নৌকা কীভাবে ১৩৮৮ ভোট পায়? তাহলে কী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতারা দলীয় সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করেছেন? তাহলে কী আওয়ামী লীগের শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়েছে? এসব প্রশ্ন এখন পুরো উপজেলা জুড়ে। 
তবে এটা স্পষ্ট এখানে গ্রুপিং রাজনীতি ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। এখানে মূল প্রার্থির বিপরীতেও কেউ কেউ প্রার্থী দিয়ে থাকে এবং গোপনে তাকে সহযোগিতাও করা হয়। বিষয়টি বেশ ক’জন নেতা-কর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও দিয়েছেন। পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে উপলক্ষ করে  জেলা পরিষদ নির্বাচনকে ইঙ্গিত করে সাহাবুদ্দিন সাবু নামের এক আওয়ামী লীগ নেতা পোস্ট করেন ‘কারিশমাটিক লিডারদের কারিশমা গেল কই। ৮নং ইউনিয়নে কোনো নৌকার পরাজয়।’ আরেক নেতা মোঃ জামাল উদ্দিন লিখেন, ‘প্রথমদিকে নৌকা প্রতীক নিয়ে আসা ছিলো কঠিন, পাস করা ছিলো সহজ। এখন নৌকা নিয়ে আসা যতটা সহজ কিন্তু পাস করা ততটাই কঠিন। ফ্যাক্ট : ৮নং পাইকপাড়া ইউনিয়ন।’ 
এদিকে নির্বাচন শেষ হওয়ার ৪ দিন পর পরাজিত প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেন মিন্টু পাটওয়ারী (নৌকা) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে বলেন, “আনারসের রস আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে অনেক মিষ্টি, তাই তারা দলের আদর্শ ও প্রতীক বাদ দিয়ে রস খাওয়ার নেশায় মগ্ন আছেন। আমি ৮০’র দশকে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছি। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য পদে দায়িত্ব পালন করছি। ফরিদগঞ্জে আওয়ামী লীগের বড় বড় প্রভাবশালী নেতা যারা সংসদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা নিয়ে আসে আমরা তাদের জন্য কাজ করি। অথচ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আসলে জননেত্রীর সেই নৌকা কোন্দায় পরিণত হয়। এই যে কোন্দা, সেই কোন্দার ব্যাখ্যার জন্য অপেক্ষা করুন। আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ রাখে প্রতিটি নেতার রেকর্ড, তথ্য ও নাম সহকারে আপনাদের সামনে প্রকাশ করবো। আমি জানি এই নামগুলো প্রকাশ করলে আমাকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হবে, তার জন্যে আমার একটুও দ্বিধা হবে না। বহু আন্দোলন সংগ্রাম করেছি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জন্যে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও জননেত্রী শেখ হাসিনা যাদের কাছে নিরাপদ নয় তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবো। আমাদের মধ্যেই খন্দকার মোস্তাকরা লুকিয়ে, যারা আগামীতে চাঁদপুর জেলা ও ফরিদগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে নেতা হতে চান।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু সাহেদ সরকার এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নের কিছু নেতা প্রতিপক্ষের নির্বাচনী মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছে। অন্যদের কথা আর কি বলবো। বিষয়টি খুবই দুঃখজন এবং হতাশার।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী ক’জনের নাম উল্লেখ করে একটি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। আমরা ওদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবো।’ 
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের পাটওয়ারী বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। মূলত এখানে ভাইলীগ, প্রতিনিধিলীগ, অমুকলীগ, তমুকলীগে দলটাকে শেষ করে দিচ্ছে। ঐখানে নৌকা পরাজয়ের প্রধান কারণ হলো সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি বাজে এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন। তাকে সাধারণ মানুষ কখনোই পরিষদে পেতেন না। সাবেক চেয়ারম্যানের প্রতীকও ছিলো নৌকা। সে কারণেই সাধারণ মানুষ নৌকা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা সত্য আওয়ামী লীগের ৯/১০টি অঙ্গ সংগঠন রয়েছে। ওয়ার্ড কমিটি রয়েছে। কমিটির লোকজন ভোট দিলেও নৌকা পরাজয় করে না। যারা নৌকার বাহিরে গিয়ে প্রকাশ্যে অন্য প্রার্থীর হয়ে কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’