• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||
  • আর্কাইভ

ব্রেকিং নিউজ

করোনা সঙ্কটে বাঙালির কফিনবন্দী ঈদ উদযাপন

জান্নাতুন নিসা

প্রকাশ:  ০২ জুন ২০২০, ১৪:২৫ | আপডেট : ০২ জুন ২০২০, ১৫:১৪
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

করোনাভাইরাসের উদাসী মৌনতায় ঝলসানো পৃথিবী আটকে আছে রাত্রির হ্যাঙ্গারে। আর স্বাপ্নিক বাঙালি দুরন্ত বকুলের টগবগে ক্রান্তির শরীরে দ্বিখণ্ডিত ব্যাথার আলিঙ্গনপানে চোখ মেলে আছে, তার নিয়তির আকাশ মেলে। যে আকাশের ফ্যাকাশে ফোয়ারায় করোনা পরিস্থিতির মাঝেই ঘরবন্দী জীবনে সংযমের সুবাতাস নিয়ে এসেছে মাহে রমজান। সেইসঙ্গে অপেক্ষমাণ কোলাহলের আনন্দে একফালি অভিমান নিয়ে শাওয়ালের জীর্ণ চাঁদও এসেছে মরচেধরা স্বপ্নের লঙ্কা মাখানো লাবণ্য নিয়ে। কিংবা বলা চলে করোকালীন সময়ে ঈদ-উল ফিতর এসেছে শঙ্কা ভেজানো উড়ন্ত অনিশ্চয়তার কম্পিত বাগানের অবিমিশ্রিত বার্তা নিয়ে। তাইতো করোনাভাইরাসের মহামারর মধ্যেই বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদ-উল ফিতর। তবে সুরক্ষা ও শারীরিক দূরত্বের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে এবারের ঈদ উদযাপন একেবারেই অন্যরকম। কোনও কোনও দেশ কড়া লকডাউনের মধ্যেই ঈদ উদযাপন করছে, আবার কোনও দেশ বিধিনিষেধ শিথিলও করেছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ-উল ফিতর উদযাপন করেন। সকালে তারা খুতবায় অংশ নেন, জামায়াতে নামাজ আদায় করেন, নামাজ শেষে হাসিমুখে কোলাকুলি করেন। বাংলাদেশেও ভিন্ন শত আয়োজনের মধ্য দিয়েই পালিত হয় পবিত্র ঈদ-উল ফিতর। অথচ এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।

সমগ্র বিশ্বের অন্যান্যদের মতো বাঙালি জীবনের চিরায়ত জীবনব্যবস্থা, ধ্যান-ধারণা আর দর্শনের কাজলমাখা স্বপ্নের হাত ধরে প্রকৃতির নিয়মেই বছর ঘুরে এসেছে ঈদ-উল ফিতর। ঈদ তো এসেছে ঠিকই কিন্তু বিশ্ব-আকাশ থেকে ফসকে গিয়েছে আনন্দ! আর বিশ্ব-আনন্দ পরিণত হয়েছে লকডাউনের প্রার্থিত মুখে বেড়ে ওঠা সামাজিক দূরত্বের অনভ্যস্ত বাঁধনের জ্বলন্ত শিখায়। তাই ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণেও ঘরবন্দী জীবনের মুখরিত সীমানাহীন আকাশের সঙ্গে মিতালী করেই সবাইকে ঘরে থেকে ঈদ উদযাপনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; সাথে সব ধরণের স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার কথাও বলেন তিনি। তিনি বলেন, 'এ বছর আমরা স্ব-শরীরে পরস্পরের সাথে মিলিত হতে বা ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে না পারলেও টেলিফোন বা ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেব'। তাই তো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে সবাই ঈদ উদযাপন করেছে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে। সবার সঙ্গে স্ব-শরীরে দেখা করে নয়, মোবাইলে ভিডিও কলে কথা বলে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছে পরস্পর। অনেকটা পেট্রোল মাখানো হাওয়ায় ভর করা সাধ্যের উজ্জ্বলতম সাধের মতো।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো লকডাউন থাকায় উৎসবপ্রিয় বাঙালি এবার পাতাঝরা বিবর্তনের সঙ্গী হতে ঘরবন্দী আয়োজনে পার করেছে ঈদ-উল ফিতর। যেখানে রৌদ্রক্লান্ত উড়ন্ত মেঘ, ঈদ উৎসবকে ভালোবেসে কৃষ্ণচূড়ার অগ্নি জলাশয়ে ডুব দিয়ে মরণের সুখ পেতে আঁছড়ে পড়েছে বাংলার মাটিতে। তাইতো ঈদের জামাত ঐতিহ্যানুযায়ী ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হওয়ার রেওয়াজ থাকলেও করোনার এই সঙ্কটে ভিড় এড়াতে মসজিদেই একাধিক ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে করোনাকালীন অদৃশ্য চঞ্চুর শিথিলতায় অনেকে মসজিদের এই ঈদ জামাতে অংশগ্রহণ করলেও আলোর ব্যালকনিজুড়ে অনেকেই অংশ নেন নি। যারা ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ করেছেন তারা সবাই মাঝখানে অন্তত একফুট জায়গা রেখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পাঁচটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় আর এখানকার দৃশ্যপটেও গতানুগতিক ভাবধারাকে দূরে ঠেলে সামনে এসে উপস্থিত হয় ভিন্নতা। কারণ আগেই পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়। সে অনুযায়ী মুসল্লিরা সারিবদ্ধভাবে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে একটি জীবাণুনাশক কক্ষের মধ্য দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই তারা নামাজ আদায় করেন। একই চিত্র ছিলো ঢাকার অন্যান্য স্থান সহ ঢাকার বাইরেও। প্রকৃতপক্ষে, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে নানা বিধিনিষেধ মেনেই দেশজুড়ে পালিত হয় মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল ফিতর।

কেবল তাই নয়! করোনাকালীন এই সঙ্কটে আতিথেয়তা প্রিয় বাঙালির ঈদ উদযাপনে ছিলো না, আত্মীয়তার বন্ধনে বেড়াতে আসা কোনো অতিথির সাজানো ভুবনের-মুগ্ধ আগল রাঙানো খুশির জোয়ার। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ঈদের দিন ছোট-বড় কেউ কোথাও বেড়াতেও যায়নি। কিংবা ঈদ জামাতের ভিড়েও ছিলো না চেনা কিংবা অচেনা কোনো মানুষের ঈদ মোবারক ধ্বনিতে, শুভেচ্ছা বিনিময়ে এগিয়ে আসা কোলাকুলির ভালোবাসায় জ্বলে উঠা তারাবাতির জাগ্রত উল্লাস। ঈদের নতুন পোশাক নিয়েও পরিবারের ছোট-বড় বেশিরভাগ কোন সদস্যদের মধ্যে ছিল না উৎসবের আমেজ। পরিবারের সুরক্ষা চিন্তায় প্রত্যেকের মাঝেই ছিলো কেবল সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিয়মতান্ত্রিক জীবনের করুণ ডানায় ঝাপটানো কিছু দ্বিধান্বিত মধুরিমা। এরই মাঝে ঘুর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে। সেই ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সহ দক্ষিণাঞ্চলীয় বেশ কিছু জেলা। এতে করে করোনাকালীন এই সঙ্কটে বাঙালির ঈদ আনন্দ হয়ে উঠে বিষণ্ন নগরীর চৈতন্যে ভেসে আসা বাতাসী বৈঠার কল্লোলিত তমসা। এসব কিছুর মাঝেও প্রকৃতির নিয়মেই সামনে এসে দাঁড়ায় আমাদের দুয়ারে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২১তম জন্মবার্ষিকী। প্রতিবছর যেমন আয়োজন করে উদ্‌যাপন করা হয়, এ বছর তা হয়নি। তবে আয়োজন থেমেও থাকে নি, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা সহ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে শুরু করে কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মীগণ সুনিপুন সুর ও শব্দের চোখে তরঙ্গিত জলপ্রবাহে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে বিদ্রোহী কবিকে স্মরণ করে তাঁর জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান উদযাপন করেন।

বিশ্বময় করোনা মহামারীর এই ক্রান্তিকালেও প্রকৃতির নিয়মে স্রষ্টা দিন-রাতের ঘুর্ণায়মানতা সচল রেখছেন, তাই পথ-পরিক্রমায় আমরা পেয়েছি ঈদ কিংবা আমাদের জাতীয় কবির জন্মতিথি। এই দুইয়ের মাঝেই আম্ফানের তাণ্ডবলীলা, সবকিছুকেই সঙ্গী করে অকুতোভয় বাঙালি যতটা সম্ভব ভিন্ন অথচ নিঃসঙ্গ উৎসব উদযাপনে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে নিজেরা মগ্ন ছিলো। সেইসঙ্গে দিন-রাত মগ্ন ছিলো করোনাভাইরাস উপড়ে ফেলে সুন্দর পৃথিবীর সুপ্ত হোমশিখা জ্বালানোর প্রার্থনায়। কারণ ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে করোনাথাবার ছড়ানো হাঁকডাক, জীবনের অনুভূতিমাখানো দেয়ালে আঘাত হেনেছে কুসুমের আকাশ ছুঁয়ে। করোনার ভয়াবহতায় টালমাটাল হয়ে আছে বিশ্ব, জনজীবন হয়ে আছে বিপর্যস্ত। তাই হয়তো উৎসবপ্রিয় বাঙালির যৌবতী সময়ের গলানো অগ্নিধ্বনিও স্তব্ধ হয়েছে কোভিড ১৯ নামক তুলতুলে মহামারীর চর্ব্যচোষ্য কঙ্কালে। এমনই ভগ্ন মঞ্জুরির সহস্র গুঞ্জনে করোনাকালীন এই সঙ্কটে বাঙালির ঈদ, পুজা কিংবা পহেলা বৈশাখের মতো শত পার্বণের বাসনায় যোগ হয়েছে এক আকাশ জলাবদ্ধ স্বপ্ন। যে স্বপ্নের তুচ্ছ উপহাসে জীবনের শতছিন্ন ভেলায় বসেই হাজারো বিধিনিষেধের হাত ধরে কফিনবন্দী ঈদ উদযাপন করেছে বাংলাদেশের মানুষ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও নারীনেত্রী